মুঠোফোনের স্ক্রিনে আঙুলের এক টোকায় আজ পুরো পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়। তথ্যের এই অবারিত স্রোতে ইউটিউব এখন কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম। কিন্তু এই বিশাল শক্তি যখন মানুষের হাতের মুঠোয় আসে, তখন তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়ে যায় বহুগুণ। বিশেষ করে যখন ভিউ আর টাকার নেশায় অন্ধ হয়ে কেউ সত্যকে বিকৃত করতে শুরু করে, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় গভীর উদ্বেগের বিষয়।
চোখ খুললেই এখন দেখা যায়, জনপ্রিয়তার লোভে অনেক কনটেন্ট নির্মাতা কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ছোটখাটো একটি ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই পাওয়ার থাকে না। অসম্পূর্ণ তথ্যকেই তারা বানিয়ে তুলছে চূড়ান্ত সত্য। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী—সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্মান ধূলায় মিশছে, এমনকি সামাজিক সম্প্রীতিও হুমকির মুখে পড়ছে।
সাংবাদিকতা কিন্তু কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব। সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা আর জবাবদিহি—এগুলোই সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড। মানুষ সংবাদের ওপর ভরসা করে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের জায়গাটি যদি কেবল অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যায়, তবে পুরো জাতির বিবেকই আহত হয়। ইসলাম ধর্মও কিন্তু আমাদের স্পষ্ট শেখায় যে, নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য ছড়ানো যাবে না। মিথ্যা বা গুজব ছড়ানো ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। সত্য যাচাই করা এবং মানুষের সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি সচেতন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
তবে একতরফা সমালোচনা করা ঠিক হবে না। সব ইউটিউবার কিন্তু খারাপ নন। এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা শিক্ষা, গবেষণা আর জনসচেতনতা মূলক কাজের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। আসল লড়াইটা তাদের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত, যারা জেনেশুনে মিথ্যার বেসাতি সাজিয়ে মানুষের বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা করেন।
একটি সুস্থ তথ্য-পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্বটা কেবল রাষ্ট্র বা গণমাধ্যমের একার নয়; এখানে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম আর আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদেরও ভূমিকা আছে। কোনো ভিডিও বা পোস্ট দেখে হুট করে বিশ্বাস না করে, উৎসটা যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখবেন, সচেতন দর্শকই পারে মিথ্যার এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঢাল হতে।
গণমাধ্যমের আসল ক্ষমতা ভিউয়ের সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের আস্থার জায়গাটিতে। সেই আস্থা রক্ষা করাই হওয়া উচিত যেকোনো প্রকৃত নির্মাতা বা সাংবাদিকের মূল লক্ষ্য। আসুন, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সাহসের সাথে তুলে ধরি। কারণ, সত্যকে সাময়িক আড়াল করা গেলেও তাকে চিরতরে হারিয়ে দেওয়া অসম্ভব। মিথ্যার ওপর ভর করে কোনো জাতি বা মাধ্যম খুব বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।