অনলাইন ডেস্ক সকালবেলা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে একটা বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়া কিংবা কাজের ফাঁকে ঝটপট পাউরুটি দিয়ে পেটের ভুক মেটানো, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অতি চেনা এক ছবি। কিন্তু এই সাধারণ খাবারটুকু বানাতে গিয়েই এখন রাতের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড় দেশের ছোট-বড় বেকারি মালিকদের। ময়দা, চিনি, তেলের চড়া দাম তো ছিলই, তার ওপর যোগ হয়েছে গ্যাস আর বিদ্যুতের ভয়াবহ ভোগান্তি। সব মিলিয়ে এমন সংকট তৈরি হয়েছে যে, বেকারিগুলোর ওভেন চালু রাখাই এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার কাকলি ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট কারখানার কথাই ধরা যাক। প্রতিদিন সকাল হলেই ভ্যান ভরে মালিবাগ ও তার আশপাশের এলাকায় রুটি, কেক ও বিস্কুট পৌঁছে দিত তারা। দিনে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকার বেচা-কেনায় দিনশেষে জমার খাতায় ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা মুনাফাও থাকত। কিন্তু সেই দিন এখন অতীত।
উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়েছে আর বিদ্যুৎ-গ্যাসের ভোগান্তিতে উৎপাদন এত কমেছে যে, লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, প্রতিদিন পকেট থেকে গুনতে হচ্ছে বিশাল লোকসান। চরম হতাশা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, ময়দা, চিনি, তেল, গ্যাসসহ উৎপাদনের সব কাঁচামালের দাম বেড়েছে। গত মাসে বিদ্যুৎ বিলও অনেক বেশি আসছে। সাত দিন আগে একটা হিসাব করে দেখেছি, আমার এক দিনেই ১৮ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এভাবে চললে আমরা ছোট ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে যাব।
একই করুণ চিত্র রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বেইলি রোড, খিলগাঁও কিংবা তেজগাঁওয়ের ছোট ছোট কারখানাগুলোর। মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় ছোট এক দোকানে বৈদ্যুতিক চুলায় বাকরখানি তৈরি করছিলেন ম্যানেজার বাবুল চন্দ্র ঘোষ। কাজের ফাঁকেই ক্ষোভের সাথে তিনি জানালেন, দিনে অন্তত তিনবার বিদ্যুৎ যায়, আর বিদ্যুৎ গেলে তাদের কাজও পুরোপুরি বন্ধ থাকে।
একই এলাকার মোহাম্মদি হাউজিং লিমিটেডের ৬ নম্বর রোডের মাথায় হক বেকারির কারখানায় গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। কর্মী আব্দুল কুদ্দুস জানান, কারখানাটিতে লাইনের গ্যাস থাকলেও তাতে নিয়মিত চাপ থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে সিলিন্ডারের এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করেই পণ্য তৈরি করতে হচ্ছে তাদের।
শুধু যে ঢাকায় এই দশা, তা নয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সুইট নেশন বেকারির ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. শামীম জানান, দিনে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা, কখনো দুই ঘণ্টাও লোডশেডিং থাকে। ফলে ঠিকমতো ওভেন চালানো যাচ্ছে না এবং উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ওদিকে রংপুর বিভাগীয় বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি ও দিনাজপুরের হৃদয় অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ জানান, দিনাজপুরের বেকারিগুলোর ৭০ শতাংশ বৈদ্যুতিক ওভেনচালিত। সাম্প্রতিক সময়ে তারা দিনে অন্তত ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন। একটানা লোডশেডিংয়ের কারণে ওভেনে থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ গিয়ে প্রতিদিনই কারও না কারও পুরো চালের পণ্য নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে পণ্য উৎপাদন কমে গেছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, ছয় মাস আগের তুলনায় খুচরায় প্রতি কেজি খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, খোলা সয়াবিন ৫ শতাংশ ও চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। এক মাস আগেই যে চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ১১০ থেকে ১২০ টাকা। একইভাবে খোলা আটার দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা এবং খোলা ময়দার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে তারা প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ময়দা ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনছেন, যা বছরখানেক আগে ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ৮০০ টাকা। একই সময়ে চিনির দাম বস্তাপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা, ডালডা কার্টনপ্রতি (১৬ কেজি) ৮০০ টাকা এবং সয়াবিন তেল ড্রামপ্রতি (১৮৫ কেজি) প্রায় ৫ হাজার টাকা বেড়েছে।
বর্তমানে সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার, যার মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ৭০০টির বেশি। এই খাতের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আছেন লক্ষাধিক মানুষ।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন আক্ষেপের সাথে জানান, বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেকারি কারখানাগুলো এমনিতে চাপে রয়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিং ও গ্যাস সমস্যার কারণে কারখানা চালু রাখাই কঠিন। ছোট কারখানাগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকঋণও পাচ্ছে না। গত ছয় মাসে শুধু ঢাকাতেই ২০টির মতো বেকারি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আমরা যারা ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা করি, পুঁজি ভেঙে খেতে খেতে এখন আমরা পুরো ঋণগ্রস্ত। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ছয় মাসে সারা দেশে ৫০০ থেকে ৬০০টি ছোট বেকারি অর্থাৎ মোট বেকারির ১০ শতাংশ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
কাঁচামালের অনিয়ন্ত্রিত বাজার আর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের জোড়া ধাক্কা সামলে এই সাধারণ ক্ষুদ্র শিল্পটি আবার কবে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে, সেই উত্তর আপাতত কারও জানা নেই।