আজ - | | হিজরী

সকালের মধ্যে ১৩ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঢাকা-১৭ আসনের পাঁচ মন্দিরে সাড়ে ৬ কোটি টাকার অনুদান ঘোষণা রিজার্ভ বেড়ে কত বিলিয়ন ডলার, জানাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুধবার চট্টগ্রামে আসছে অকটেন ও ফার্নেস অয়েলের দুটি জাহাজ আবারও ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি ট্রাম্পের টঙ্গীতে ভয়াবহ আগুন, প্রায় ৪০ বস্তিঘর পুড়ে ছাই কুমিল্লা নামেই বিভাগ চাইলেন ড. খন্দকার মোশাররফ সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রকাশ বিএসএফের গুলিতে কৃষক আহত, পাল্টা ধরে আনা হলো ভারতীয় কৃষককে প্রিয় শিক্ষিকার অবসরে ব্যতিক্রমী সংবর্ধনা রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন কোয়েল মল্লিক পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ‘কলকাতা হামলা’ মন্তব্যে ক্ষোভ মমতার এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৪৮ হাজার লিটার মজুত তেল উদ্ধার ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বিকট বিস্ফোরণ ইরা   

মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই: শাস্তি নয়, সচেতনতা ও পুনর্বাসনই পথ।

News Tarunner khobor
  • আপডেট টাইম :   সোমবার | জানুয়ারি ১২, ২০২৬ | ০৫:৫৬ পিএম
  • ২৪৩ বার
নিজস্ব প্রতিবেদক

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তরুণদের হাতে। কিন্তু সেই তরুণ সমাজ যখন ধীরে ধীরে মাদকের ছোবলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তখন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য- আমরা কোথায় ভুল করছি? মাদক আজ আর গোপন কোনো অপরাধ নয়, এটি এক নীরব মহামারির মতো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা প্রতিদিন খবরের কাগজে মাদক উদ্ধার, গ্রেপ্তার, কিংবা মাদকাসক্তের মৃত্যুর সংবাদ পড়ি, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তা ভুলে যাই। এই ভুলে যাওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

মাদক সমস্যাটি এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক, মানসিক ও নৈতিক সংকট। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শহর ও গ্রাম, ধনী ও দরিদ্র, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত- সব শ্রেণির মানুষের মাঝেই মাদকের উপস্থিতি লক্ষণীয়। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা কিংবা নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগ সবই সহজলভ্য হয়ে উঠছে। এই সহজলভ্যতাই মাদককে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।

বিশেষ করে তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ আজ মাদকের দিকে ঝুঁকছে। জীবনের নানা চাপ, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি, প্রেম ও সম্পর্কজনিত হতাশা- এসব কারণ অনেককে ঠেলে দিচ্ছে নেশার জগতে। প্রথমে কৌতূহল বা বন্ধুর প্ররোচনায় শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা পরিণত হয় মারাত্মক আসক্তিতে। তখন সেই তরুণ আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না; তার স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও মানবিক মূল্যবোধ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

মাদকের প্রভাব কেবল ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো পরিবার ও সমাজকে গ্রাস করে। একটি পরিবারে মাদকাসক্ত সদস্য থাকলে সেখানে নেমে আসে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক বিপর্যয়। সংসারের অর্থ মাদকের পেছনে ব্যয় হয়, বিশ্বাসের সম্পর্ক ভেঙে যায়, সন্তানরা বেড়ে ওঠে ভয়ের পরিবেশে। অনেক ক্ষেত্রে এই পরিবারগুলো সামাজিকভাবেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

সামাজিক পর্যায়ে মাদক অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, সহিংসতা ও নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে মাদকাসক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একজন মাদকাসক্ত তার নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সহজেই অপরাধের পথে পা বাড়ায়। ফলে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

রাষ্ট্র মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন করেছে, নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে- এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র গ্রেফতার ও শাস্তি দিয়ে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি একদিকে যেমন আইনের চোখে অপরাধী, অন্যদিকে সে একজন রোগীও। তাকে শাস্তির পাশাপাশি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। এই জায়গায় আমাদের গ্রহীত উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয়।

বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা সীমিত, আর অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মানসম্মত চিকিৎসা, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর এবং সামাজিক পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা ছাড়া একজন মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো কঠিন। এই খাতে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি।

মাদক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরিবার থেকেই একজন শিশুর নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, খোলামেলা কথা বলার সুযোগ এবং মানসিক সমর্থন থাকলে সন্তান সহজে বিপথে যায় না। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শুধু পাঠ্যবই নয়, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও আলোচনা তরুণদের সচেতন করে তুলতে পারে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদককে কোনোভাবেই গ্ল্যামারাইজ করা যাবে না। বরং এর ভয়াবহ পরিণতি, বাস্তব গল্প ও পুনর্বাসনের সফল উদাহরণ তুলে ধরতে হবে, যাতে মানুষ সচেতন হয় এবং আশা পায়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকের প্রচ্ছন্ন প্রচার রোধেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

সবশেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে আসে- আমরা কি দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি না? আশপাশে মাদক বিক্রি বা সেবনের খবর জেনেও অনেক সময় আমরা চুপ থাকি। এই নীরবতাই মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তি জোগায়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিবাদ করা, তথ্য দেওয়া এবং সমাজকে সচেতন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

মাদকমুক্ত সমাজ গড়া কোনো অসম্ভব স্বপ্ন নয়, তবে এটি রাতারাতি সম্ভবও নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, সামাজিক ঐক্য এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আজ যদি আমরা সাহস করে দাঁড়াই, কথা বলি এবং দায়িত্ব নিই, তবে আগামী প্রজন্ম একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ পেতে পারে।

জাহিদ আহমেদ চৌধুরী


শিক্ষা ক্যাটেগরির আরো সংবাদ