বিশেষ প্রতিবেদক ঢাকাশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাউশির মহাপরিচালকের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানোর পর সম্প্রতি শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জাতীয়করণের তালিকায় স্থান পেতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে তদবির শুরু হয়েছে।
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে যোগাযোগের পাশাপাশি আবেদন জমা দিচ্ছেন। বিভিন্ন সংসদ সদস্যের ডিও লেটার ও সুপারিশপত্রও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ছে বলে জানা গেছে। এতে প্রকৃত অর্থে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে কলেজ পর্যন্ত প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ৬ লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয়করণের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খসড়া তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সরকারি করা হয়েছে।
বান্দরবানের থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ তিনটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সরকারিকরণের প্রজ্ঞাপন পেয়েছে। পাশাপাশি শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরির কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছরে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ বা সরকারিকরণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত কি না, প্যাটার্নভুক্ত শিক্ষক রয়েছে কি না, শিক্ষার্থীদের ফলাফল কেমন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় আগে থেকেই কোনো সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে কি না।
সাধারণত আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মাউশিকে দায়িত্ব দেওয়া হলে মাউশি সংশ্লিষ্ট বোর্ডের মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপ ও সুপারিশের কারণে অনেক সময় মন্ত্রী-এমপিরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের জন্য সুপারিশ পাঠান। এতে যোগ্যতার নিরিখে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাঁদের মতে, জাতীয়করণের ক্ষেত্রে অভিন্ন ও স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত সুপারিশ যেন যোগ্যতার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক অধ্যাপক বলেন, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ একটি বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভৌগোলিক প্রয়োজন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারিকরণ করা হলে তা শিক্ষার বিস্তার ও সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতিমালা ছাড়া ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তাঁর মতে, এতে একদিকে বৈষম্য তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতেও রাজনৈতিক তদবির ও সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু অযোগ্য প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের অভিযোগ উঠেছিল।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ এপ্রিল বগুড়ার এক সমাবেশে গাবতলীতে অবস্থিত শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই ঘোষণার পর কলেজটি সরকারিকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
এ ছাড়া গত ২৫ আগস্ট বগুড়ার শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় সরকারিকরণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শিবগঞ্জ সরকারি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
গত ২৭ আগস্ট বগুড়ার গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ও সরকারিকরণ করা হয়। নতুন নাম দেওয়া হয়েছে গাবতলী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
গত ২০ জুলাই ভোলার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—চরফ্যাশনের ফাতেমা-মতিন মহিলা মহাবিদ্যালয়, চরফ্যাশন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মনপুরার সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
এদিকে শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরে আবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে শুরু করেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে—রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত তদবিরের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণের আওতায় আনা।